bdtime

বঙ্গাব্দ ꘡

শিমুল মাহমুদ’র প্রবন্ধ ꘡ পোস্টমডার্নিজম : ইলিউশন অ্যান্ড রিয়েলিটি

শিমুল মাহমুদ

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্স একুশ শতকে এসে আবারো যৌক্তিক প্রেক্ষিতে আমাদের সামনে সভ্যতার গতিবিধিকে সতর্ক পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে আসে। ফলে সঙ্গত কারণেই বর্তমান সভ্যতায় ঘটমান বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে পোস্টমডার্নিটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা দাবি করে। যদিও গবেষণাকালে আমার সংশয় জেগেছে, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি কি কিছুটা সংক্ষুব্ধ নয়? যার ওপর দাঁড়িয়ে আদৌ কি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভব? আদৌ কি নিরপেক্ষতা বলে কিছু আছে, বা সম্ভব? আমাদের কি সব সময় সতর্ক অবস্থায় থেকে অর্থাৎ আমরা আদার’ / ‘হীনএই সতর্কতা মাথায় নিয়ে বৈশ্বিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে না? সম্ভবত তৃতীয় বিশ্বের মানুষের ভেতর এহেন সংশয়বোধ চালান করে দেওয়াটাও ছিল পোস্টমডার্নিজমের আরেকটি অভিসন্ধি। এ রকম প্রাসঙ্গিক অভিসন্ধিসমূহ বিবেচনায় রেখেই বর্তমান প্রবন্ধটি পোস্টমর্ডান বিষয়ে বহুরৈখিক চিন্তন-ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে আগ্রহী। সে লক্ষ্যে প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব, যুক্তি-তথ্যের আশ্রয়ে এখানে সতর্ক ও পৃথক দৃষ্টি উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। 


       ০১             

পশ্চিমা সভ্যতায় পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে গত শতকের গোড়ার দিকে; আমাদের দেশে শতকশেষে এসে বিভ্রম ছড়িয়েছে; যার পেছনে ক্রিয়াশীল থেকেছে এবং এখনও ক্রিয়াশীল রয়েছে আধিপত্যবাদের কারসাজি। সে বিষয়ে প্রসঙ্গক্রমেই আসা যৌক্তিক। তার আগে আমাদের যে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত তা হল, আমাদের জন্য পোস্টমডার্নিজমঅভিধাটি কেন এবং কীভাবে প্রযোজ্য ও প্রাসঙ্গিক? পাণ্ডিত্যের দাসত্ব / চিন্তার দাসত্ব থেকে আমাদের অ্যাকাডেমিশিয়ানরা মুক্ত হওয়ার যোগ্যতা না রাখার কারণে পোস্টমডার্ন-এর অনুবাদ করা হয়েছে উত্তরাধুনিক; যেন বা আধুনিকতা শেষে উত্তরাধুনিকতার ভেতর বসবাস করছি আমরা। বিষয়টি এহেন সরলরৈখিক নয় মোটেও; নয় শুধু কালপ্রকাশজ্ঞাপক অভিধা; বরং, এটি গ্লোবালপলিটিক্স; পক্ষান্তরে সভ্যতা-নির্দেশক সূচকচিহ্ন। অথচ এমনতর গ্লোবালপলিটিক্সের বিষয়টি কেন প্রাসঙ্গিক, কী কারণে অনিবার্য এবং কোন বাস্তবতায় তা আমলযোগ্য, সে বিষয়ে কোন দায়িত্বশীল অভিধা চিহ্নিত না করেই ইতোমধ্যে পশ্চিমাদের নব্যজ্ঞানের তকমা বাজারিকরণ প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটি আমলে আনা হচ্ছে। এটিও উদ্দেশ্যবাচক বৈশ্বিক পলিটিক্সের দাসত্ব বটে।

আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি লিখিয়েদের ভেতর বিষয়টিকে আমলে আনা হয় গত শতকের নব্বইয়ের দশকে; যখন পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি এক দল কবিতাসেবক দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন নিজেদের বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত করার গোয়ার্তুমিতে; দাবি করতে থাকলেন, চর্চা করতে থাকলেন বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তারা নতুন ইতিহাসের নির্মাতা। অবশ্য এ হেন গোয়ার্তুমি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে যে শেষাবধি সম্ভাবনার ভূমি নির্মাণ করতে পেরেছে সে কথা এখন দায়িত্ব নিয়েই বলা সম্ভব। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিগত শতকের আশি-নব্বইয়ের উল্লম্ফনের ধারাবাহিকতায় বাঙালিদের কবিতা স্পর্ধার সাথেই তার প্রথাগত ফর্ম থেকে এমনকি প্রথাগত অন্তর্বস্তু থেকেও অনেকটা সরে এসেছে।

       ০২           

এক্ষণে প্রসঙ্গের প্রয়োজনে আমাদের কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করে নিতে হচ্ছে।  ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, কারণ বিষয়গুলো অর্থাৎ অনুসন্ধানসমূহ নতুন প্রসঙ্গ নয় মোটেও; সময় পরম্পরায় ধারাবাহিক তো বটেই সেইসঙ্গে পুরোনোও বটে। অথচ প্রাসঙ্গিকতার কারণেই বিষয়গুলো নতুন করে ভাবার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।  দায়িত্ব নিয়েই বলা সম্ভব, আলোচ্য বিষয়টি বর্তমান শতকে এসে আবারও প্রাসঙ্গিক ডিসকোর্সের সুযোগ উন্মোচন করতে সক্ষম।

ক. পোস্টমডার্নিজম কি মডার্নিজমের ধারাক্রম প্রকাশজ্ঞাপক অভিধা?
খ. আধুনিক এবং উত্তরাধুনিকের সম্পর্কটা কেমন?
গ. পশ্চিমের মডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিজমের নিকট তৃতীয় বিশ্বের অর্থাৎ আমাদের অবস্থান কোথায়?
ঘ. পশ্চিমবঙ্গে কেন পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিকতার সূত্রপাত হল?
ঙ. আমাদের দেশে উত্তর আধুনিকতার বিষয়টি কীভাবে চর্চা করা হয়েছে, হচ্ছে এবং এর যৌক্তিকতা ও ফলাফল কেমন?
চ. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? অর্থাৎ সতর্কতা কতটুকু এবং কেনই বা এই সতর্কতা?

প্রাসঙ্গিক পরিবেশ পেলে আমি বিষয়গুলো নিয়ে এভাবে কথা বলার চেষ্টা করে থাকি, প্রকৃত বাস্তবতায় মডার্নিজমহল একই সঙ্গে পুঁজির বিকাশ ও পুঁজি-কুক্ষিগতকরণ-কৌশল। আর পোস্টমডার্নিজমমূলত পুঁজি প্রদর্শনের পুঞ্জিভূত প্রকাশ। বিশ্ব এখন এই প্রকাশ-প্ররোচনায় আত্মহারা। মজার বিষয়টি হল, এহেন প্রকাশবৈশিষ্ট্য ব্যক্তিমানবের অনেকগুলো অনিবার্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি; যা অনিবার্য এবং সার্বিক বিবেচনায় গুরুত্ববহ বটে; যাকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে আর্কেটাইপপ্রিফেক্স দিয়ে। এই আর্কেটাইপএখন সামষ্টিক অর্থাৎ পরিণামে গ্লোবালভূমিকায় ক্রিয়াশীল। বৈশ্বিক বিবেচনায় লেট-ক্যাপিটালিজমের মতই পোস্টমডার্ন এক জটিল ঘিরিঙ্গি; যার ফলশ্রুতিতে পশ্চিমারা যেভাবে বিষয়টিকে নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই খেলছে আমরাও তা অনুসরণ করছি বা সেই খেলায় যুক্ত হচ্ছি।

পোস্টমডার্ন প্রবক্তাদের ভেতর একদিকে যেমন সক্রিয় ছিলেন জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার অন্যদিকে বদ্রিআর। আবার পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই, মার্কসবাদী ফ্রেডারিক জেমসনকে; যিনি মার্কসবাদী হওয়া সত্ত্বেও পোস্টমডার্নের গুরুত্বকে হ্যাঁ-বাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিতর্ক উত্থাপন করেছেন। নওম চমস্কি বিষয়টি আমলে আনলেও তিনি নিজেকে পোস্টমডার্ন বলে স্বীকার করেন না বা তার সাথে পোস্টমডার্নের তকমা যুক্ত করা সম্ভবও নয়। নওম চমস্কি প্রসঙ্গক্রমে দুটো বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র দুটো বিষয়কে ভয় পায়, প্রথমটি জাতীয়তাবাদ’; যার ভিত্তিতে জাতিগুলো সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়টি, ইসলাম ধর্মে নয়; বরং ভয় আছে রাজনৈতিক ইসলাম’-এর ভেতর। (ডেভিড বারসামিয়ান, নওম চমস্কির সাক্ষাৎকার : পাওয়ার সিস্টেম)

সঙ্গত কারণেই যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গিবাদের মাধ্যমে ইসলামকে টিকিয়ে রাখতে চায়; যাতে রাজনৈতিক ইসলামজেগে উঠতে না পারে। যদিও ভিন্ন অর্থে ইসলামমূলত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ’; যার জন্য ভারত বিভাজিত হতে বাধ্য হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হল, পোস্টমডার্নিজমের সাথে জাতীয়তাবাদ এবং জঙ্গিবাদের সম্পর্ক কোথায়? সম্পর্ক আছে, পোস্টমডার্নিজম স্পষ্টভাবেই বিপ্লবে বিশ্বাসী নয়; কাজেই মার্কিনিদের পক্ষে, পশ্চিমাদের পক্ষে অর্থাৎ পোস্টমডার্নের পক্ষে জাতীয়তাবাদটিকিয়ে রাখা যৌক্তিক নয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যৌক্তিক, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় পোস্টমডার্ন ভাবনা ও অন্যান্যপুস্তকে বিবিধ প্রমাণাদি হাজির করে দেখিয়েছেন যে তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবেই পোস্টমডার্নে পরিত্যক্ত।

এক. টোটালাইজেশন অর্থাৎ মৌলিক মানবসত্ত্বা, সামূহিক লক্ষ্য ও সীমা অতিক্রান্ত অজ্ঞেয় বিষয়-বিষয়ী সংক্রান্ত ডিসকোর্স।
দুই. টেলিওলোজি, তা অথরের দিক থেকেই হোক বা ঐতিহাসিক অনিবার্যতার কারণেই হোক পরম-কারণবাদপোস্টমডার্নে পরিত্যক্ত।
তিন. ইউটোপিয়া বা কল্পস্বর্গ পোস্টমডার্নে পরিত্যক্ত; হোক তা প্রগতি-বিজ্ঞান-শ্রেণিসংগ্রাম এবং যাবতীয় বিশ্বাসজাত; লিওতার যেগুলোকে বলেছেন ‘grand recits ’। (পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, পোস্টমডার্ন ভাবনা ও অন্যান্য)

আমরা জানি, মডার্নিজমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ অতিক্রম করে প্রথম বিশ্বগুলো এখন গ্লোবালাইজেশনের প্রাকটিস করছে। পোস্টমডার্নিজমের অনিবার্য ভিজ্যুয়াল সূচকচিহ্ন গ্লোবালাইজেশন। আমরা জাতীয়তাবাদ অর্জন করার আগেই গ্লোবালাইজেশনের দিকে পতঙ্গের মতো ছুটতে বাধ্য হচ্ছি। বিশ্বায়ন সভ্যতায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কোন প্রকার সতর্কতা কাজে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। যদিও আমরা পশ্চিমাদের নিকট আদার্স’/‘অপর’/‘হীন। তথাপি আমরা আত্মপ্রসাদ লাভ করি এই ভেবে, আমরাও আধুনিক যুগের প্রাপ্তি ও সংকট অতিক্রম করে আরও এক ধাপ সভ্য হয়ে উঠতে শুরু করেছি; আমরাও উত্তরাধুনিকের সিড়িতে পা রেখেছি। অথচ আসুন খতিয়ে দেখা যাক, প্রকৃত বাস্তবতা কেমন?

জন্মগতভাবেই মানুষ স্বার্থপর। স্বার্থ হস্তগত করার তাড়না থেকে আধিপত্যের সূচনা। মানুষ যখন বলে, সে নিরপেক্ষ; তখন সে মিথ্যা বলে। প্রকৃত বাস্তবতায় সে তার স্বার্থ রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমকে সচল রাখতে প্রয়োজন মাফিক ছাড় দেয় মাত্র। সিস্টেমটা আসলে কী? সিস্টেমের নাম আধুনিকতা। এই সিস্টেমকে জায়েজ করতে বুর্জোয়ারা আধুনিকতার ভেতর দুটো অভিজ্ঞানের উৎপাদ করেছে। একটি হল মানুষআরেকটি জাতি। অভিজ্ঞানের এই উৎপাদকে বলা হয় মূল্যবোধমূল্যবোধআধুনিকতার আরেকটি সূচকচিহ্ন; যার সাথে সম্পৃক্ত ধর্ম এবং বর্ণ।

প্রকৃত প্রস্তাবে আধুনিকতাধর্মীয় মূল্যবোধের দান। পশ্চিমা আধুনিকতা আমাদের পেটে-পিঠে হামলে পড়ার আগে আমরা অতিক্রম করে এসেছি দাস যুগ / সামন্ত যুগ। যাই হোক না কেন এই সামন্ত যুগের পেটের ভেতর থেকেই কিন্তু বেরিয়ে এসেছিল আধুনিক যুগ; যার রক্ষাকবচ হল ধর্ম। এমে সেজায়ার খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় অপরাধী খ্রিস্টধর্ম প্রচারকগণ। সভ্যতায় এরাই অন্যায্য সমীকরণ তৈরি করেছে : খ্রিস্টধর্ম = সভ্যতা, পৌত্তলিকতা = অসভ্যতা। (এমে সেজায়ার, ঔপনিবেশিকতার মুখোশ উন্মোচন, Discourse on Colonialism)
 প্রকৃত বাস্তবতায় এহেন সমীকরণ থেকেই ঔপনিবেশিকতার উত্থান। আধুনিকতার আরেকটি হাতিয়ার হল, ‘ঔপনিবেশিকতা। তৃতীয় বিশ্ব অর্থাৎ আমরা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার দাস; চৈতন্যে, জ্ঞানে, মননে ও রাষ্ট্রগঠনে।

১৯৪৭-এর পর ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সরে এসে আমরা এখন উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্বের সভ্যতায় বসবাস করছি; যা পক্ষান্তরে পোস্টমডার্নিজমের সূচকচিহ্ন। অর্থাৎ পশ্চিমারা মডার্নিজমের অবক্ষয় থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের পথ পরিহার করে উত্তর-ঔপনিবেশিকতার প্রাকটিস জারি করেছে; যে প্রাকটিসের সামনে প্রতিপক্ষ বলতে বোঝায় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়া জাতি/গোষ্ঠী/রাষ্ট্র; যারা মূলত অপর’/ ‘আদার্সঅর্থাৎ হীন। এই হীনদের পথ বাতলাবার পায়তারা চালাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বগুলো ভার্চুয়াল সভ্যতায় বিমূর্ত মানবতার আশ্রয়ে গ্লোবালবিশ্বে অধিকতর সভ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে; পক্ষান্তরে যা পোস্টমডার্নিজমের চেহারা।

প্যারোডি করলে যে সত্যটি প্রকাশ পায় তা হল, প্রথম বিশ্ব যখন তৃতীয় বিশ্বগুলোতে উপনিবেশ কায়েমের মাধ্যমে শাসন চালিয়ে সভ্য-জীবনের পথ বাতলায় তখন তা হয়ে ওঠে আধুনিক’; আর যখন পশ্চিমারা ঔপনিবেশিক শাসনপ্রক্রিয়া উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং তখন যে উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্ব জারি থাকে তা মূলত পোস্টমডার্নিজমের ক্যারিজমা; যার বদৌলতে তারা পোস্টমডার্নআর আমরা হলাম আদার্স’, ‘অপর’, ‘হীন’; যে পোস্টমডার্নিজমের বদৌলতে প্রথম বিশ্বগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রিত করে; এবং আমরা অনুগত থাকতে বাধ্য থাকি। প্রকৃত প্রস্তাবে পোস্টমডার্নিজমের আতুরঘর হল ফ্যাসিবাদ। কেউ মডার্নিজমের ধারাবাহিকতায় একে মিলিয়ে দেখেন কেউ বা আধুনিক যুগের সাথে বিচ্ছেদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রধান তাত্ত্বিক কবি এমে সেজায়ার (১৯১৩-২০০৮), জন্ম মার্তিনিকে, যার অবস্থান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জে। দ্বীপটি ১৬৩৫ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক দখলে আসার পর ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের শাসনাধীন বিভাগে পরিণত হয়। অথচ ফ্রান্সের সঙ্গে মার্তিনিকের দূরত্ব প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার; যেখানে উৎপাদনের স্বার্থে সেনেগাল, অ্যাঙ্গোলা, গিনি প্রভৃতি আফ্রিকান দেশ থেকে দাসদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হার্লেম রেনেসাঁর উত্তরসূরি ও নেগ্রিচুড আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা সেজায়ার ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাঁর ডিসকোর্স অন কলোনিয়ালিজমবইটিতে বলেন, ঔপনিবেশিকতা সবচেয়ে সভ্য মানুষটিকেও অমানুষে পরিণত করে (এমে সেজায়ার, ঔপনিবেশিকতার মুখোশ উন্মোচন, Discourse on Colonialism)বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ কীভাবে অপরবিশ্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে; বর্ণবাদী দাম্ভিকতা কীভাবে চার্চ এবং বুদ্ধিজীবীদের মদদে সবকিছুকে মানবিক ও আধুনিক মূল্যবোধে রূপান্তরিত করে একচেটিয়া পৃথিবীর শাসক হয়ে উঠেছে।

সেজায়ারের এমনতর বাস্তবতা নির্ভর সমাজবিশ্লেষণ থেকে পোস্টমডার্নিজমের চেহারাটি ক্রমশ খুঁজে নেয়া সম্ভব। এরই সূত্র ধরে বলা যায়, পোস্টমডার্নিজম মূলত আধিপত্য বিস্তারকারী বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর জাগতিক-মানবীয়-দৈত্য থেকে ক্রমশ ভার্চুয়াল বিশ্বে অতিমানব হয়ে ওঠার এক ধরনের অতিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থা; যা মুক্তবাজার অর্থনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; যার বাইরে আমরা কেউ নেই; কারও থাকা সম্ভবও নয়। যে অবস্থাকে সেজায়ার বলেছেন, আমেরিকান আধিপত্যবাদ; এমন এক আধিপত্য যা থেকে অক্ষত অবস্থায় দূরে থাকা কারো পক্ষেই, অর্থাৎ কোন জাতি রাষ্ট্র বা সংস্কৃতির পক্ষে সম্ভব নয়। প্রসঙ্গক্রমে পোস্টমডার্নিজমের কট্টর সমালোচক নওম চমস্কি বলেছিলেন, নিজের ব্যাপারে একান্ত যত্নশীল হও এবং অন্য সবাইকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দাও- এটি ব্যবসায় আইনের মৌলনীতি। [...] যুক্তরাষ্ট্র একটি ব্যবসায়-চালিত সমাজ, তার তুল্য অন্য যেকোনো সমাজের চেয়ে বেশি (ডেভিড বারসামিয়ান, নওম চমস্কির সাক্ষাৎকার : পাওয়ার সিস্টেম, অনু., শফিকুল ইসলাম)। পশ্চিমা মডার্নিজম তথা পোস্টমডার্নিজমের চেহারা বুঝতে হলে বর্তমান সভ্যতায় পশ্চিমাদের সাথে অপরাপর বিশ্বের এহেন ব্যবসায়িক সম্পর্ক অবশ্যই আমলযোগ্য।

উপনিবেশবাদ, উত্তর-উপনিবেশবাদ প্রসঙ্গ দুটো পোস্টমডার্নিজম প্রসঙ্গে অনিবার্যভাবেই একাধিকবার চলে আসে। কীভাবে মেধা ও জ্ঞানকে আয়ত্বে রাখতে হয়, তা প্রথম বিশ্ব পোস্টমডার্নিজম প্রকল্প মারফত নিশ্চিত করে দেয়। উদাহরণ হিসেবে নাইজেরিয়ার ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবের কথা বলা যেতে পারে। চিনুয়া তার The African Writer and English Language প্রবন্ধে ইংরেজি ভাষার আধিপত্যের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিও আনুগত্য দেখাতে কার্পণ্য করেননি। চিনুয়া আচেবে তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন,
বৃটিশ শক্তি এখানে অনেক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করেছে যেগুলো এর আগে নিজ নিজ বিভক্ত পথে চলত। বৃটিশ উপনিবেশ তাদের সকলের জন্য ব্যবহারের একটি যৌথ ভাষাও দিয়েছে যা দিয়ে এক গোষ্ঠীর সাথে আরেক গোষ্ঠী এখন ভাষাগত অভিন্নতায় কথা বলতে পারে। উপনিবেশ তাদের যৌথ অনুভবের একটি গান দিতে না পারলেও কমপক্ষে তাদের দীর্ঘশ্বাসগুলো প্রকাশের জন্য একটি জিভ দিয়েছে। [...] সুতরাং আফ্রিকার যে লেখকরা কলোনাইজারের ভাষা ইংরেজি বা ফরাসিতে লিখছেন তাঁরা দেশপ্রেমিক নন কিংবা তাঁরা বিদেশের মাটিতে সৌভাগ্যের দাও মারার ধান্দায় রয়েছেন এমনটা ভাবা ঠিক নয়। যে পদ্ধতিতে আফ্রিকার নতুন জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে তাঁরা সে পদ্ধতির একটি উপজাত মাত্র।
(ড. তপন বসু, ‘‘থিংস ফল এ্যাপার্ট পাঠের জন্য’’, মুহম্মদ মুহসিন সম্পা., ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে পাঠ ও বীক্ষণ, ঢাকা : কবি, ২০১৬)

নর্থ ক্যারোলিনা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আফ্রিকান সাহিত্যের অধ্যাপক ওদে এস. ওগিদি তাঁর দ্যা কনটেক্সটস অব আচেবেস রাইটিঙসপ্রবন্ধে চিনুয়া আচেবের ভেতরে ঔপনিবেশিকতার প্রতি আনুগত্যের কারণ অনুসন্ধান করেছেন। এই কারণসমূহ আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক; যা কীনা উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণে সহায়ক। ওদে ওগিদি চিনুয়া আচেবের নেমড ফর ভিক্টোরিয়াএবং কুইন অব ইংল্যান্ডপ্রবন্ধ দুটোর প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন,
ঔপনিবেশিক শাসনের বড় বড় কৌশলগুলোও বুঝতে আচেবে ব্যর্থ ছিলেন এবং এ ব্যর্থতা ছিল চমকে দেয়ার মতো। আরো পরোক্ষে এই ব্যর্থতা ইঙ্গিত করে যে, কলোনাইজারদের অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে ছিল তাদের মূল্যবোধগুলো তৈরি করার ও মানুষের মগজে গেঁথে দিতে পারার গোপন সব পথপ্রক্রিয়া। [...] মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই চর্চা ছিল একটি মোক্ষম অস্ত্র যা দ্বারা তারা তাদের অধীনস্থদের তাদের মানবতার প্রাথমিক শর্ত বা অবস্থাগুলো থেকেও বঞ্চিত করতে পারত। এই অস্ত্র তথা এই বিষ পশ্চিমা আকর্ষণের মধ্যে মোড়কবদ্ধ ছিল এবং আছে। আচেবে সেই আকর্ষণে আবিষ্ট থাকার কারণেই সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ যে জটিল পন্থায় কাজ করেছে সে-পন্থাগুলো আচেবে সন্দেহও করতে পারেননি এবং উন্মোচিতও করতে পারেননি। অনুভবই করতে পারেননি যে, তার মনোরাজ্য ক্রমশ শাসিতদের নিয়ন্ত্রণের মাঝে আটকে পড়েছে।’’
(ওদে এস. ওগিদি, “দ্যা কনটেক্সটস অব আচেবেস রাইটিঙস”, মুহম্মদ মুহসিন সম্পা., ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে পাঠ ও বীক্ষণ, ঢাকা : কবি, ২০১৬)

পোস্টমডার্নিজম খুব সূক্ষভাবে একটি কাজ করে চলেছে, তা হল আধুনিকতার সুবিধাসমূহ যা বুর্জোয়াদের পক্ষে কার্যকর, এর বিপরীতে তৃতীয় বিশ্বের বা আদার্সচিন্তকদের প্রতিক্রিয়াসমূহকে বৈধতা দান করা; যেন বা দেখুন আমরা কতটা সহিষ্ণু ও সভ্য; সৎ এবং মানবিক।  এভাবে চলতে থাকে অতিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ার চর্চা; যা সচল রাখতে পোস্টমডার্নিজমের খাঁচায় আশ্রিত বুদ্ধিজীবীগণ সক্রিয়; যেটা ঘটেছে চিনুয়া আচেবের ক্ষেত্রেও।  এমে সেজায়ার এহেন অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, পক্ষান্তরে পশ্চিমারা প্রতিনিয়ত অত্যন্ত সুচতুরভাবে বৈশ্বিক মানবিক সমস্যাগুলোর ভ্রান্ত উপস্থাপনা করে চলেছে; অর্থাৎ সমস্যাগুলোর ঘৃণ্য সমাধানকে তারা বৈধতা দান করছে। এগুলো মূলত ছদ্মবেশী মানবতাবাদ।  পোস্টমডার্নিজম আধুনিক মানবতাবাদকে ছদ্মবেশী মানবতাবাদে রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কার্যকর ও গতিশীল করতে সক্রিয়।  সেজায়ার বলছেন, ছদ্মবেশী মানবতাবাদের বিরুদ্ধে আমার প্রধান অভিযোগ এই যে, অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এটি মানুষের অধিকারকে খর্ব করে আসছে।  তাদের মানবাধিকারের ধারণাটি আগেও খুব সংকীর্ণ ও ভঙ্গুর, অসম্পূর্ণ এবং পক্ষপাতদুষ্ট ছিল, এখনো তা একই রয়ে গেছে।  এর সমস্ত আদর্শ ও কর্মকাণ্ড ঘৃণ্য। এর সমস্ত আদর্শ ও কর্মকাণ্ড উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বর্ণবাদপ্রসূত। ’’ (এমে সেজায়ার, ঔপনিবেশিকতার মুখোশ উন্মোচন, Discourse on Colonialism)

সেজায়ারের এ মন্তব্যের সূত্র ধরে বলা সম্ভব, মডার্নিজমের প্রাক-প্রচেষ্টা ছিল, বৈশ্বিক সমস্যাগুলোকে অর্থহীন ধারণায় রূপান্তর করে বিকৃত সত্যকে বিশ সযোগ্য করে তোলা; পক্ষান্তরে পোস্টমডার্নিজমের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গতিশীলতার একটি চিহ্নিতকরণ চেহারা হল, মানবসমাজের সবচেয়ে গুরুত্ববহ সমস্যাগুলোকে আয়েশি ধারণায় উন্নীত করার অবিরাম বুর্জোয়া প্রচেষ্টা জারি রাখা।

অরিয়েন্টালিজম বইতে এডওয়ার্ড সাইদের অবস্থান স্ট্রাকচারালিজম ও পোস্টস্ট্রাকচারালিজমের বিপক্ষে। যদিও প্রথম বিশ্বের দাদাগিরিকে সাইদ সমর্থন করেন না তথাপি শেষ পর্যন্ত ওরিয়েন্টালিজম পরিণত হয় সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানে। পোস্টমডানির্জমের চেহারা বোঝার জন্য ওরিয়েন্টালিজমের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ আবশ্যক।  ওরিয়েন্টালিজমের আলোচনায় ভারতবর্ষ একটি জনপ্রিয় ডিসকোর্স।  সেখানে ভারতবর্ষকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে বিগত দু তিন শ বছরের ভেতর ভারতবর্ষে কোন পরিবর্তন আসেনি; ভারতবর্ষ যেন একটা রূপকথার দেশ; নির্বোধ, গর্দভ এবং অসভ্য।

অরিয়েন্টালিস্টদের দৃষ্টিতে অরিয়েন্টহলো নিঃশব্দ ও নির্বাক, অক্রিয় ও অপরিবর্তিত, ক্ষমতাশূন্য ও প্রতিবাদহীন। এই বিশ্লেষণ থেকে পশ্চিমী বিশেষজ্ঞদের মনোভঙ্গিটা বেরিয়ে আসে; তা হলো : পশ্চিমই প্রতিভ ও সক্রিয় ও বলীয়ান; আর প্রাচ্য নিষ্ক্রিয় ও অচেতন ও দুর্বল; পশ্চিমের সংস্কৃতি আছে এবং সে সংস্কৃতি উৎকর্ষে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, প্রভাববিস্তারে তুলনাহীন; প্রাচ্য যেহেতু স্থবির, জড়বৎ ও আলোড়নহীন কাজেই তার সংস্কৃতি যদি থাকেও তবু তা তুচ্ছ ও আলোচনার অযোগ্য।  যেহেতু পশ্চিম উন্নত, যেহেতু পশ্চিম সক্রিয়, যেহেতু পশ্চিমের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য আছে, কাজেই সেই ঐশ্বর্যের জোরে পশ্চিম অধিকার রাখে প্রাচ্যকে শাসন করার, কর্তৃত্বপ্রয়োগ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার।  এভাবে অরিয়েন্টালিজমের ডিসকোর্সে ঔপনিবেশিক শাসনের বৈধতা তৈরি হয়েছে।  প্রথমদিকে অরিয়েন্টালিজমছিলো বিশেষজ্ঞদের একটা ডিসকোর্স, ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানে।’ (সালাহউদ্দীন আইয়ুব, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা)

ক্ষমতাশীলদের অ্যাচিভমেন্টগুলোর প্রচার-প্রক্রিয়াই বস্তুত ইতিহাসের বয়ান বা টেক্সট।  তা সত্ত্বেও আমরা সময়ের অভিজ্ঞানে ধারাবাহিকতাকেই ইতিহাসের ক্যানভাস বলে স্বীকার করে আসছি।  যেখানে জড়াজড়ি করে থাকে বৈচিত্র্যমুখী মুহূর্তের সমষ্টি এবং মিথ; যা বস্তুত ঐতিহ্যনামক অভিধায় নিরবিচ্ছিন্ন আবর্তন।  অথচ এই নিরবিচ্ছিন্নতাও অস্থিরতায় ঠাসা; যে ঐতিহ্যসাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং ঔপনিবেশিকতার মধ্য দিয়ে বদলে যেতে বাধ্য।  এভাবে বার বার বদলে যাওয়া ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর পক্ষে মিথ ও সংস্কৃতির ধরন-ধারণ সংরক্ষণ যখন অসম্ভব হয়ে ওঠে তখন তা আধুনিকতার চেহারা নিয়ে প্রকাশমান।

এ অর্থে আধুনিকতা হল ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ক্রমশ প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর ধরন-ধারণ, চিন্তা-ভাষা ও সংস্কৃতি অনুসরণ করার এক অবচেতন তাড়না যা শেষাবধি জাতিগত চেহারায় ভিজ্যুয়াল হয়ে ওঠে; যার ফলশ্রুতিতে আমাদের ভাষা-চিন্তা-সংস্কৃতি ক্রমশ ভার্চুয়াল সভ্যতার / সেটেলাইট সভ্যতার অনুগামী।  এরই ধারাক্রমে উদাহরণ টানা সম্ভব।  আমি সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সময় কাটাচ্ছিলাম নির্ধারিত ডোমেস্টিক ফ্লাইটের জন্য।  এ অবস্থায় লন্ডনগামী একটি পরিবারের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে।  ভদ্রলোক লন্ডনে রেস্তোরাঁর ব্যবসা করেন।  তার দুই পুত্র, দুই কন্যা।  তারা পোশাকে, চেহারায়, আচরণে, বিশেষ করে ভাষায় না ব্রিটিশ না বাঙালি না সিলেটি।

এই যে প্রথম বিশ্বগুলো ভিন্ন বিশ্বের মানুষ ও সংস্কৃতিকে আত্মকৃত করে চলেছে, এর ফলে সভ্যতায় তৈরি হচ্ছে এক ধরনের মিশ্রসংস্কৃতি।  সারা বিশ্বে এই মিশ্রসংস্কৃতির তোড়জো পশ্চিমা আধুনিকতার গোড়া থেকে শুরু হলেও বিশেষ করে বর্তমান শতকে এসে তা ভিজ্যুয়াল হয়ে উঠতে শুরু করেছে।  অভিবাসিরা এখন সংশ্লিষ্ট স্টেটগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হতে শুরু করেছেন।  তো এভাবেই হাই মর্ডানিজম অপরবা হীনসংস্কৃতিকে আত্মকৃত করার, পক্ষান্তরে অপরদের সংস্কৃতিকে বিলুপ্তকরণের পথ বাতলে দিচ্ছে; আর পোস্টমডার্নিজমতাকে গ্লোবালাইজেশনের তকমা লাগিয়ে ব্রান্ডিং করে দিচ্ছে।  তো এ অবস্থায় এভাবেই চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে পোস্টমডার্নিজম নিয়ে পুনর্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; হতে থাকবে।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুক্তিবাদ আধুনিক যুগের একটি বিশিষ্ট লক্ষণ বলে স্বীকার করা হলেও আমাদের ভাবতে হয়, যখনই এ চিন্তনের আড়ালে বিকৃত সত্যের উদ্ভাসন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই ধর্মনিরপেক্ষতা এবং যুক্তিবাদের প্রয়োগ ব্যহত হয়েছে।  ফলশ্রুতিতে স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক যুগের আপাত নিরীহ চেহারাটি অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়েছে।  এ অবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে আধুনিকতার মাপকাঠি হিসেবে আমলে নেওয়া হলে দেখা যাবে, অর্থনৈতিক প্রবৃত্তির সমবণ্টনের প্রশ্নে প্রযুক্তি বিকাশের শুভাশুভ সম্পর্ক নির্ণয়ের অবকাশ আধুনিক সভ্যতায় আমলে আসেনি।  অথচ পশ্চিমা চিন্তাবিদগণ মনে করেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলো যে প্রক্রিয়ায় উন্নত দেশগুলোর ধরন অর্জন করে আসছে সেই প্রক্রিয়াতে সংযুক্ত থাকতে পারাই আধুনিকতা

মজার বিষয়টি হল, এই প্রক্রিয়াতে সংযুক্ত থেকেও আমরা বুঝতে পারি, এ প্রকারের আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার ভেতরে কার্যকর থাকে এক ধরনের রোমান্টিক তাড়না যা আমাদের পশ্চিমামুখী হতে বাধ্য করে।  জীবনানন্দের ভাষাপ্রকল্পের মত এ তাড়নাও এক ধরনের সামাজিক সম্ভাবনার সূচনা করে।  যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গত শতকের হাই মডার্নিজমকে অগ্রবর্তী করেছিল বলে ধরে নেওয়া হয়।  প্রশ্ন উঠতে পারে কী এমন নতুন চৈতন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিল যার জন্য হাই মডার্নিজম’-এর প্যারালাল ভাবনায় পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে?

কালপর্ব এবং যুগদর্শনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় রেঁনেসাস থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কে মর্ডান-এজ বিবেচনায় রেখে তাঁরা পরবর্তী সময়কে পোস্টমর্ডান-এজ-এর আওতাভুক্ত করতে চায়।  কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই তাঁদের দর্শনে, সমাজে, রাষ্ট্রে, সংস্কৃতিতে, সহিত্যে বিশেষ করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন সূচিত হতে শুরু করেছে, যা কিনা বৃহত্তর অর্থে পশ্চিমাদের সার্বিক জীবন প্রণালীকে পালটে দিয়েছে।

ইহাব হাসান ১৯৮২ সালে তার দ্য ডিজমেমবারমেন্ট অব অর্ফিয়ুস : টোয়ার্ড এ পোস্টমডার্ন লিটারেচর’- এ মডার্নিজম এবং পোস্টমডার্নিজমের তুলনামূলক চেহারা চিহ্নিতকরণের চেষ্টা করেছেন।  হাসান বলতে চেয়েছেন, মডার্নিজম মূলত রোমান্টিসিজম ও প্রতীকবাদের অনুসারী; যা ফর্মবদ্ধ, উদ্দেশ্যবাহিত, স্তরবিন্যাসে আবর্তিত তথা যুক্তিবাহিত, লক্ষাভিমুখী শিল্প যার সমাপ্তি অনিবার্য; দূরত্ব সংরক্ষণকারী ও টোটালিটিতে বিশ্বাসী ফলে সমন্বয়কের ভূমিকায় অগ্রবর্তী; প্রকরণ ও সীমা সচেতন; উপস্থিতি ও নির্বাচনমুখী; টেক্সট ও ব্যাখ্যা অনুসারী; দ্যোতিত এবং ঈশ্বর-আক্রান্ত তথা অধিবিদ্যা ও আয়রনি অনুসারী হলেও সিদ্ধান্তপ্রবণ।

পক্ষান্তরে পোস্টমডার্নিজম রোমান্টিসিজম ও প্রতীকের পরিবর্তে ম্যাটাফিজিক্স তথা দাদাবাদের আশ্রয়ী; ফর্মকে অস্বীকার করে অ্যান্টিফর্মমুখী; উদ্দেশ্যবাহিত শিল্পের পরিবর্তে ক্রীড়াবৈচিত্র্যে গতিশীল; স্বরবিন্যাসের জায়গায় বেছে নিয়েছে নৈরাজ্য বা বিশৃঙ্খল অবস্থা; আর যুক্তির পরিবর্তে নৈঃশব্দ।  পোস্টমডার্নিজম মনে করে সৃজনশীলতা তথা সমাজ সমাপ্তিবিহীন; এটা বরং ঘটমানতা বা পারফরমেন্স আশ্রিত; দূরত্ব নয় বরং অংশগ্রহণ; শিল্পের বা সমাজের টোটালিটি বা সমগ্রায়ন সম্ভব নয় বরং যা ঘটে তা হল বি-সৃজন বা বিনির্মাণ; সমন্বয়ের প্রয়োজন অর্থহীন, উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয়; প্রকরণ প্রধান শর্ত নয় বরং প্রধান শর্ত হতে পারে অন্তর্বস্তু ও অন্তর্বয়ান; নির্বাচন বা যথেচ্ছ নির্বাচন নয় বরং তা হতে পারে একত্রায়ন; পাঠনির্ভরতা অপেক্ষা অ-ব্যাখ্যা বা ভুল পাঠই শ্রেয়; যেখানে থাকে শিল্পের সম্ভাবনা।

এক্ষেত্রে হাইডেগারের যোগ্য উত্তরসূরী, যিনি নিৎশেকে আমলে রেখেছেন যৌক্তিক পরম্পরায় তিনি জাক দেরিদা। দেরিদা মনে করেন, শিল্পের কাজ ডিফারেন্স মানা এবং ডিফারেন্স ভাঙা।  সময় ও মানুষের বৈচিত্র্যে যে কোন বয়ানের কনটেক্সটপালটে যেতে বাধ্য।  কারণ টেক্সট ব্যক্তির বয়ান বটে, অথচ তার পাঠক অসংখ্য।  পাঠের পদ্ধতি, পাঠের মনস্তত্ত্ব আর পাঠ-ব্যাখ্যার সংস্কারও বহুমাত্রিক।  এ কারণেই দেরিদার অনুসরণে বলা হয়ে থাকে টেক্সট মূলত সিস্টেম অব ডিফারেন্স’; যেখানে বয়ানের মর্মপাঠে থাকে অজস্র রূপ ও রূপান্তর; ক্রিয়া ও ক্রীড়া।  এ প্রসঙ্গে দেরিদার বিনির্মাণবাদের সারকথা উদ্ধৃতিযোগ্য, ‘বিনির্মাণবাদ যুক্তির বাইরে অবস্থান নেওয়া ব্যাখ্যা-মন্তব্যের এক নিরন্তর, শৃঙ্খলাহীন এমনকি বুনো স্বাধীনতার নাম।  বিনির্মাণবাদ মৌলিকভাবে ইতিবাচক।  এটি স্মৃতির পুনরাধিষ্ঠানকে হ্যাঁ বলে। বিনির্মাণবাদী সমালোচনা কোনো গ্রন্থের পূর্ণতা পাওয়ার পথ দেখায় না, বরং আবশ্যকীয় অপূর্ণতাকেই দেখায়। বিনির্মাণবাদ বলে যে, কোনো টেক্সট কোনো কিছুর প্রতি পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না, এবং দেখানো উচিতও নয়। অপূর্ণতা, অপর্যাপ্ততা, অনপরিহার্যতা এসব বিনির্মাণবাদের সূত্র।’ (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, জ্যাক দেরিদা : বিনির্মাণবাদকে হ্যাঁ বলুন)

এক্ষণে বিনির্মাণবাদের সূত্র ধরে বলা সম্ভব, টেক্সট মূলত দ্যোতকরাশির অনন্ত সম্ভাবনার এক্সক্লুসিভ মঞ্চ; যেখানে উপস্থিত থাকে রিসিভার ও মাউথপিস; সেই মাউথপিসের আড়ালে রয়েছে চেতনা-উন্মোচক বা মর্মোন্মোচক অনুশীলন; যা বহুস্বরপূর্ণ বিপদজ্জনক প্রতিসংকেত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে টেক্সট প্রথাগত ভাষিক ব্যাকরণ ও বাগার্থকে অস্বীকার করে নতুন ভাষিকসংকেত, প্রতিসংকেত, অধিসংকেতের বয়ানভূমি হাজির করতে বাধ্য থাকে। যেখানে বিরাজ করে এক শব্দ থেকে আরেক শব্দের ভেতর গ্রহান্তরের ফারাক। এই ফারাক থেকেই পোস্টমডার্ন-আশ্রিত টেক্সট আমাদের প্ররোচিত করে।

আমরা জানি মডার্নিজম দ্যোতিতকে বেশি গুরুত্ব দেয় অথচ পোস্টমডার্ন দ্যোতকআশ্রিত পাঠে বিশ্বাসী; যে পাঠ অসম্ভব সম্ভাবনাকে মুক্ত করে দিতে উন্মুখ; যা বাসনানির্ভরও বটে; যা শেষাবধি এক ধরনের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তও বটে; যা ঈশ্বরের পরিবর্তে পবিত্র ভূতের উপাসক; যার কোন মীমাংসা কখনোই সম্ভব নয়।

পোস্টমডার্নিজম বাচনের ক্ষেত্রে মনে করে বাচন দুশ্রেণির। প্রথমটি দলিত বাচন দ্বিতীয়টি কর্তৃত্বকারী বাচন।  উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, নারী এবং পুরুষ। এক্ষেত্রে নারী দলিত বাচন আর পুরুষ কর্তৃত্বকারী বাচন।  এখানে দলিত বাচন অগ্রসরমান ভমিকায় অবতীর্ণ হয়, ফলে কর্তৃত্বকারী বাচন ছাড় দিতে বাধ্য হয় আর এই উভয় অবস্থার মধ্যে বিনির্মাণ সংঘটিত হয়।  ফলাফলে গণতন্ত্রের জমি তৈরি হতে থাকে।

আরেকটি উদাহরণ আবশ্যক।  ধরা যাক শ্রমিক এবং মালিকের সম্পর্ক।  এক্ষেত্রে শ্রমিক দলিত বাচন আর মালিক কর্তৃত্বকারী বাচন।  এখানেও শ্রমিক অগ্রসরমান আর মালিক ছাড় দিতে বাধ্য হয় ফলে বিনির্মাণের দ্বারা পাওয়া যায় গণতন্ত্রের জমি।  এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে উভয় উদাহরণের জন্যই প্রতিটি সম্পর্ক পৃথক।  এহেন দলিত বাচন আর কর্তৃত্বকারী বাচনের আবর্তনে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে বিপ্লব হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না।  কিংবা উভয় উদাহরণে ভাববিনিময় সম্ভব নয়।  কেননা পোস্টমডার্নিজম কোনো নির্ধারণবাদে অর্থাৎ Determinism এ বিশ্বাস করে না। সুতরাং সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে বিপ্লব অথবা রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদের কোন আস্থা নেই।

প্রথম উদাহরণের পুরুষ বাচনটি স্ত্রী বাচনের বিপরীতে কর্তৃত্বকারী বাচন হওয়া সত্ত্বেও ঐ পুরুষ বাচনটি যদি দ্বিতীয় উদাহরণের শ্রমিক বাচন হয়ে থাকে তবে সে হয়ে যাবে দলিত বাচন।  এভাবে সমাজে প্রতিটি বাচনই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন বাচনে রূপ নিয়ে থাকে।  এভাবেই সমাজে দলিত বাচন কোন কোন ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে কর্তৃত্বকারী বাচন আবার কর্তৃত্বকারী বাচন কখনও বা দলিত বাচন।  ফলে সমাজে প্রত্যেক স্তরেই তৈরি হতে থাকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি; ফলে কারো পক্ষেই জোট বাঁধা সম্ভব নয় এবং সম্ভব নয় বিপ্লব, শ্রেণিসংগ্রাম অথবা বৃহৎ কোন পরিবর্তন নিয়ে আসা। প্রণিধানযোগ্য, পোস্টমডার্নিজম বিপ্লবে বা শ্রেণিসংগ্রামে বিশ্বাস রাখে না।

দলিত বাচন এবং কর্তৃত্বকারী বাচনের সম্পর্ক স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে শহীদুল জহিরের ইন্দুর-বিলাই খেলাগল্পটি উৎকৃষ্ট উদারহরণ হওয়ার যোগ্যতা রাখে।  প্রথম অংশের মতো গল্পটির শেষ অংশেও ছক কেটে উল্লিখিত বাচন দুটোর সম্পর্ক চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।  গল্পের শেষ অংশে পাওয়া যাচেছ, ‘এই খেলার শেষ নাই, খেলোয়াড়ের শেষ আছে; খেলোয়াড় খেলা ছেড়ে যায়, কিন্তু খেইল জারি থাকে।  উল্লেখ্য যে, বালকদের খেলা ছাড়া অন্যান্য খেলার ক্ষেত্রে, বিভিন্ন কারণে, যেমন: বুইড়া হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা খেলতে খেলতে ক্লান্ত বা বিরক্ত হয়ে গেলে কিংবা জীবনে হঠাৎ দরবেশি ভাব দেখা দিলে, কেবল বিলাইরা ইচ্ছা করে খেলা ছেড়ে যেতে পারে, ইন্দুররা পারে না; বিলাই খেলতে চাইলে ইন্দুরকে খেলতে হবে।’ (শহীদুল জহির, ইন্দুর-বিলাই খেলা)

বৈশ্বিক সভ্যতার প্রেক্ষিতে বলা যায় মধ্যযুগকে নিয়ন্ত্রণ করেছে মৃত্যু।  আর আধুনিক যুগের মানুষের স্বভাব হল নিজেকে অতিক্রম করা।  ফলে মৃত্যু অনিবার্য জেনেও তারা মৃত্যুর কারণ উন্মোচন করে মৃত্যুকে বিজ্ঞানের বাটখাড়ায় মেপে নিয়ে ঈশ্বরের জায়গায় নিজেকে প্রতিস্থাপন করেছে।  আমার তো মনে হয় পোস্টমডার্নিজমের যুক্তিহীন শৃঙ্খলাভঙ্গপ্রক্রিয়া শেষাবধি মানবপ্রজন্মকে স্বর্গ-নরক মৃত্যু এইসব ফোবিয়া থেকে মুক্ত করে অতিমানবের পর্যায়ে টেনে তুলতে শুরু করবে।  যদিও আধুনিক যুগের যন্ত্রসভ্যতার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটির শুরু হয়েছে অনেক আগেই; যে প্রক্রিয়াতে দেখা গেছে মানুষের জায়গা দখল করে নিচ্ছে যন্ত্র; আর পোস্টমডার্নে এসে মানুষ নিজেই ক্রমশ যন্ত্রে রূপান্তরিত হতে হতে তৈরি করে নিচ্ছে কর্পোরেট লাইফ; মানুষের পাশাপাশি সোফিয়ানামের রোবটটিকে দেয়া হয়েছে নাগরিকত্ব। গ্লোবালপলিটিক্সের আওতায় সোফিয়াকে নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটিকে আরও একটি ধাপে বিতর্কিত করে বটে।

হেগেলের বক্তব্য অনুসরণ করে মধ্যযুগের সংকট থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের সমাজ-মানস-চেতনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।  হেগেল মনে করতেন, যদিও মানবসমাজ বস্তুর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম; তথাপি মানুষ এও জানে শরীরের ক্ষয় অনিবার্য অথচ সময় অনন্ত।  এ অবস্থায় যুক্তিবোধ মানুষকে কীভাবে সুখী করবে? অর্থাৎ চৈতন্য মূলত অসুখী এবং অসুখী চৈতন্য শেষাবধি বুঝতে পারে, যুক্তি অকার্যকর।

এ ধরনের সংকট দস্তয়েভস্কি, আঁদ্রে জিদ অথবা নিৎশে সহ অনেকের ভেতরই দেখা গিয়েছে।  যুক্তিবাদিতার ওপর ক্রিয়াশীল থেকেছে এক ধরনের নৈরাশ্য; যা আধুনিক যুগের সংকট; যে সংকট বস্তুত মধ্যযুগের ধারাক্রম।  অথচ যুক্তি থেমে থাকেনি।  যুক্তির পাশাপাশি আকাক্সক্ষা অর্থাৎ স্বপ্নও দমিত হয়নি।  আমি তো সেই স্কুলে থাকা অবস্থাতেই যুক্তিহীনভাবেই বিশ্বাস করতাম মানবসমাজ এক সময় মৃত্যুকে অতিক্রম করবে।  এই যে যুক্তিহীন স্পর্ধা ও আকাক্সক্ষা ও বিশ্বাস, এই বিশ্বাস ও স্বপ্ন কিন্তু আধুনিক যুগের যুক্তিবাদিতা থেকেই উৎসারিত।  কেননা আধুনিকতার যুক্তিবাদী চৈতন্যই মানুষকে স্পর্ধিত করে তুলেছে; সীমা লঙ্ঘন করতে শিখিয়েছে।

একই ভাবে আমরা সভ্যতার যাবতীয় ক্ল্যাসিকের ভেতর দিয়ে সীমা লঙ্ঘিত হওয়া স্পর্ধা প্রকাশ পেতে দেখেছি।  দেবতারা পরাজিত হয়েছে মানুষের কাছে; প্রমিথিউস নয় পক্ষান্তরে মানুষই দেবতা হয়ে উঠেছে।  আধুনিক যুগ যুক্তি পরম্পরায় মানুষকে স্পর্ধিত করে তুলেছে; আর পোস্টমডার্নিজম সেই স্পর্ধাকে প্রয়োগ করতে মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে তাড়িত করেছে।  অর্থাৎ মডার্নিজম যুক্তিনির্ভর হলেও পোস্টমডার্নিজম সেই যুক্তির সাথে যোগ করে নিয়েছে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও স্পর্ধা; সীমা লঙ্ঘন করার স্পর্ধা।  পক্ষান্তরে প্রথম বিশ্বের নাগরিকগণ ক্রমশ দেবতা হয়ে উঠেছে।  এভাবেই মডার্নিজম-এর অবক্ষয়ে পোস্টমডার্নিজমের মধ্য দিয়ে দেবতার জায়গায় আমরা দেখতে পাচ্ছি মানুষকে; যে মানুষগুলো প্রকৃত বাস্তবতায় দেবতা না হলেও অতিমানব তো বটেই; তা না হলে ক্রিতদাস প্রথার যুগ পিছে ফেলে এসে আমরা এখনও দাসত্ব করছি কেন? চিন্তার দাসত্ব, অর্থনীতির দাসত্ব, সংস্কৃতির দাসত্ব এমনকি অহমের দাসত্ব।  প্রকৃতির সিস্টেমটাই কি যোগ্যতমের দাসত্ব? এই হল বুর্জোয়া সভ্যতার চেহারা; যার সাথে সব ক্ষেত্রেই রয়েছে দলিত বাচন আর কর্তৃত্বকারী বাচনের পারস্পরিক সম্পর্ক; যে বাচন দুটো পোস্টমডার্নিজম দ্বারা চিহ্নিত।

আধুনিক যুগের লক্ষণ, ‘প্রচারেই প্রসার।  আর পোস্টমডার্নিটি হল ভোগেই প্রসার।  মডার্নিজম বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাসী; অতীতের অথরিটি সে স্বীকার করতে ইচ্ছুক নয়।  পোস্টমডার্নিজম অতীতকে জাগিয়ে তুলতে ইচ্ছুক।  এই জাগিয়ে তোলার পেছনে ক্রিয়াশীল থাকে প্রশ্ন করার প্রবণতা; হতে পারে তা যে কোন রকমের প্রাকধারণা বিষয়ে প্রশ্ন, হতে পারে মডার্নিটি, পোস্টমডার্নিটি অথবা আভাগার্দ বিষয়ে।  কিন্তু পোস্টমডার্নিজম কোন প্রশ্নের উত্তর প্রদান যৌক্তিক বিবেচনা করে না।  বরং প্রকৃত সত্যের উন্মোচনে তারা একটি প্রশ্নের উত্তরে আরও প্রশ্নের জন্ম দেওয়াই বিধেয় মনে করে। কেননা তারা মনে করে জ্ঞানের রাজ্যে কোন উত্তরই নিজ অবস্থানে স্থির বা ধ্রুব নয়।

স্থাপত্যকলা, নাট্যকলা, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, সংগীত অথবা নৃত্যকলায় পোস্টমডার্নিটি যে অর্থে চিহ্নিত করা সম্ভব; যতটা সম্ভব হয়েছে সমাজবিন্যাসের রূপ সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে পোস্টমডার্নিটি চিহ্নিত করা, সে অর্থে সাহিত্যে তা সম্ভব নয়। কেননা পোস্টমডার্নিটি শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোন বিস্ময়কর বিকাশ ইঙ্গিত করে না; বরং পোস্টমডার্নিটির ভেতর রয়েছে এক ধরনের পেছনমুখিতা; অতীতচারিতায় আছে তার এক ধরনের আসক্তি।  পোস্টমডার্নিটি মনে করে, আধুনিকতা তার বিশাল কর্মযজ্ঞ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে।  এখন প্রয়োজন ভোগের।  ভোগের জন্য প্রয়োজন স্মৃতিআক্রান্ত নস্টালজিক চৈতন্য।  গত শতকের সত্তর আশির দশকে মার্কিন সংস্কৃতিতে এই নস্টালজিয়া বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল।  এটাকে বলা হয়ে থাকে নব্য রক্ষণবাদী নস্টালজিয়া’; যার পরিণাম উত্তর-পুঁজিবাদী যুগে সৃষ্টিশীলতার পতন। ফলশ্রুতিতে বলা সম্ভব, উগ্রতায়, হঠকারিতায় ও নস্টালজিয়ায় শেষ পর্যন্ত পোস্টমডার্নিজম সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পরিচয় বহন করতে অক্ষম।   

গত শতকের ষাটের দশকে ফ্রান্সে দেখা দিয়েছিল মডার্নিজমের দিকে প্রত্যাবর্তনের ঝোঁক; যখন পোস্টমডার্নিজমের লক্ষণে দেখা দিয়েছে এক ধরনের অব্যবস্থাপনা বা ধারাচ্যুতি; এই সময়ে আমরা পাই পোস্টমডার্নিজমের গুরু মার্সেল দুকাম্পেকে।  এ সময়ে সিভিল রাইট মুভমেন্ট, এন্টি-ওয়ার মুভমেন্ট, কাউন্টার কালচার বিবিধ চেহারা নিয়ে পোস্টমডার্নিজম ক্রমশ দৃশ্যমান হতে থাকে।  যদিও তখনও সবকিছুই ছিল আবেগতাড়িত।  পিটার বার্জার এ পর্যায়ের পোস্টমডার্নিজম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, এ সময়টাকে বলা সম্ভব ইন্সটিটিউশন আর্টের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠা।

থিওরি অব দ্য আভাগার্দবইতে পিটার বার্জার দেখিয়েছেন, আভাগার্দ আন্দোলনের সময় অর্থাৎ যখন ইন্সটিটিউশন আর্ট অর্থাৎ বুর্জোয়া-প্রতিষ্ঠান শিল্প’-এর বিপক্ষে জনমত তৈরি হতে শুরু করেছে তখন আমেরিকায় পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রেও ঠিক এমন জনমত দেখা গেছে।  যদিও আভাগার্দ আধুনিকতারই এক ধরনের সমান্তরাল রূপ, তথাপি এই চেহারাটি আমেরিকাতে ভিন্নভাবে পোস্টমডার্নিজমের সাথে যুক্ত হতে থাকে।  আমরা দেখতে পাই, তখন মডার্নিজম আশ্রিত উচ্চমার্গীয় শিল্পকলা সমাজ ও রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে বৈধতা দিয়েছে; কালচারাল এসটাবলিশমেন্টকে সমর্থন করেছে।  এই এসটাবলিশমেন্টের বিপক্ষে আভাগার্দ ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ।  বলা সম্ভব, ষাটের দশকের পোস্টমডার্নিজম এই আভাগার্দ থেকেই পুষ্টি পেয়েছে।

ষাটের দশকের নান্দনিকতাকে বলা হয়ে থাকে টেকনিক্যাল এসথেটিকস।  এই টেকনিক্যাল এসথেটিকসের কারণে পপুলার কালচার ও উচ্চমার্গীয় এই দু ধরনের কালচারই হুমকির সম্মুখিন হয়।  এটাও এক ধরনের পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়।  এরপর সত্তরের দশকে আমেরিকায় নব্য-বাম মুভমেন্ট, কাউন্টার কালচার তথা যুদ্ধবিরোধী মুভমেন্ট পোস্টমডার্ন তথা আভাগার্দ মুভমেন্টকে ক্রমশ দৃশ্যমান করে তোলে।  হাই-কালচারের সাথে মাস-কালচারের মুখোমুখি অবস্থান, স্নায়ুযুদ্ধ, পুঁজিবাদী বিশ্বের সঙ্গে কম্যুনিস্ট বিশ্বের বিরোধ; ক্রমশ কম্যুনিস্ট বিশ্বগুলোর অসারতা বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে নতুন ডিসকোর্সের পটভূমি তৈরি করতে থাকে।  পাশাপাশি বিশ্বসভ্যতায় সূচিত হতে থাকে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অব ওয়ারঅর্থাৎ যুদ্ধের শিল্পায়ন। এই যুদ্ধের শিল্পায়নের প্রাক্কালে ম্যাক্স ওয়েবারের মতো অনেকেই বিশ্বাস করেছেন আমলাতন্ত্রের বিকাশ ব্যতিত বস্তুগত প্রগতি সম্ভব নয়।  অথচ বুরোক্রাসি প্রাকটিসের ক্ষেত্রে সফলতার মন্ত্রটি লুকিয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সৃষ্টিশীলতার গলা টিপে ধরার ভেতর।  আধুনিকতার এই রহস্যটিকে পোস্টমডার্নিজম কীভাবে পাশ কাটিয়েছে তা ভাববার বিষয়।  অথবা আদৌ তা সম্ভব কিনা এ বিষয়ে ডিসকোর্সের অবকাশ রয়েছে।

এ অবস্থা অতিক্রম না করতেই সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজতত্ত্বে জায়গা করে নিতে থাকে ফেমিনিজম।  এ সময় এনলাইটমেন্ট-এর পাশাপাশি মডার্নিজমের সঙ্গে আফ্রিকী ও অরিয়েন্টাল শিল্পকলার সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের রাজনীতি পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রে নতুন ক্ষেত্র নির্মাণ করে।  এ অবস্থায় হেবারমাস পোস্টমডার্নিজমকে নব্যসংরক্ষণবাদের সমান্তরালে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন পোস্টমডার্নিজমের ভেতরও রয়েছে রক্ষণশীলতা; যার জন্য পোস্টমডার্নিজমকে পেছনে ফিরতে হয়েছিল।  ফলশ্রুতিতে নস্টাজিয়া-আশ্রিত অতীতকেন্দ্রিকতা পোস্টমডার্নিজমকে যুক্তির পরিবর্তে আবেগনির্ভর করে তোলে।

পোস্টমডার্নিজম নিয়ে কথা বলতে হলে জর্মন চিন্তাবিদ হেবারমাস এবং ফরাশি চিন্তাবিদ লিওতারকে আমলে আনা প্রাসঙ্গিক।  হেবারমাস অনেকটাই ছিলেন এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট দ্বারা আলোকিত আধুনিকতার ব্যাখ্যার সহযোগী।  জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা প্রেস থেকে ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত দ্য পোস্টমডার্ন কনডিশন : এ রিপোর্ট অন নলেজএবং ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত দ্য পোস্টমডার্ন এক্সপ্লেইনডবইয়ে বলার চেষ্টা করেছেন, পরিণত পুঁজিবাদের গন্তব্য পারফরমিটি প্রিন্সিপলঅর্থাৎ প্রদর্শনযোগ্যতা; স্পষ্ট করে বললে দাঁড়ায় সম্ভাব্য সর্বোত্তম প্রদর্শনযোগ্যতা’; যা শেষ পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টকে ছাপিয়ে পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্র নির্মাণ করে।  লিওতার বলতে চেয়েছেন, পুঁজিবাদ অনিবার্যভাবেই সবকিছুকে পণ্য করতে ইচ্ছুক অথচ আধুনিক শিল্পকলা পণ্য হতে অনিচ্ছুক; পণ্যের স্বভাব বিনিময়; আধুনিক শিল্পকলা বিনিময়ে বিশ্বাসী নয়।  কিন্তু পোস্টমডার্নিজমের প্রশ্ন, শিল্প কি শেষ পর্যন্ত পণ্য নয়? শিল্প কতদূর পর্যন্ত নিজেকে পণ্যের আওতামুক্ত রাখতে সক্ষম?

এই প্রশ্নের সূত্র ধরে বলা সম্ভব, মডার্নিজম জীবনকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিল নান্দনিকতার সুতোয়; অথচ পোস্টমডার্নিজম জীবন উপভোগের ক্ষেত্রে নান্দনিকতাকে মনে করছে বিভ্রম যা কিনা প্রবৃত্তিকে প্রতিহত করে। পোস্টমডার্নিজম দেখিয়ে দিতে চেয়েছে প্রেরণা ও প্রমোদই মোক্ষ; যা কিনা জীবন-উদ্দীপক বাস্তবতা; এর বাইরে সবকিছুই নিউরোসিস ও মৃত্যু; উপভোগের প্রধান শত্রু  ‘যুক্তি’; যুক্তিকে ঝেটিয়ে দিলে যে বাসনাসমূহ আমাদের ঘিরে রাখে, শরীরের সেই বাসনার নাম সুখ; এই সুখই পরম সত্য; বস্তুনিষ্ঠ চৈতন্য অকার্যকর, আবেগই কার্যকর।  এ প্রসঙ্গে ফ্রয়েডের কথা স্মরণযোগ্য।  সিগমুন্ড ফ্রয়েড সভ্যতার বিকাশের সাথে মানুষের লিবিডোবৃত্তির সঙ্গতি খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন একদিকে প্রবৃত্তির দাবি অন্যদিকে সভ্যতার ট্যাবু বা নিষেধ; পোস্টমডার্ন এই নিষেধ বা ট্যাবুমুক্তিতে বিশ্বাসী।  অতীতকে আমলে এনেই তারা ট্যাবু থেকে মুক্ত হতে চেয়েছে; জেনে বুঝেই আধুনিক যুগের নীতিবোধ ও মূল্যবোধ থেকে নিজেদের বিযুক্ত করতে চেয়েছে।  এই হল লিবিডোতাড়িত অতিমানব যা পোস্টমডার্নের প্রডাক্ট।

মিশেল ফুকোর মতে যুক্তির যুগকে অর্থাৎ আধুনিক যুগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে মানুষের পাগলামি।  ফুকো তার পাগলামি ও সভ্যতাবইতে যে কথাটি বলতে চেয়েছেন তা হল, পাগলামি জ্ঞানের একটা রূপকল্পই শুধু নয় বরং পাগলামি হল তা-ই যেখানে অযুক্তির উপর যুক্তির কোন প্রাধান্য থাকবে না; যার রয়েছে এক ধরনের মেটাফিজিক্যাল পাওয়ার।  এই পাগলামিরই একটা চেহারা পর্নোপপ কালচার।  এভাবে ভাবতে থাকলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, পোস্টমডার্ন এমন এক মুড যা কিনা প্রবৃত্তির কাছে যে কোন ধরনের শৃঙ্খলা ও বিবেচনা তছনছ করে দেয়; ছিড়ে ফেলে শিকল ও সীমা।  মিস্টিসিজম অর্থাৎ আধুনিক যুগের যে শক্তি, রহস্যবাদ যা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, সেই রহস্যবাদকে সেই আধ্যাত্ম্যিক সত্তাকে অস্বীকার করে পোস্টমডার্ন।  ফলে পোস্টমডার্নিটি এলোমেলো করে দেয় শরীর এবং মনের জৈব ও আধ্যাত্মিক সত্তা, অনুভব ও আধুনিকতা-নির্ভর তাবৎ নৈয়ায়িক ব্যাকরণ।

পশ্চিমাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় তাদের প্রাত্যহিক জীবনচর্চা, সংস্কৃতিজগতের সংবেদনশীলতা ও ডিসকোর্সে উল্লিখিত বিষয়গুলো এতটাই দৃষ্টিগ্রাহ্য যে পোস্টমডার্নিটিকে এখন আর অস্বীকার করার কোন জো থাকে না।  এ অবস্থায় পোস্টমডার্নিজম বিষয়ে মন্তব্য করেছেন সরকার আজিজ তাঁর ঔপনিবেশিকতা, কবিতা ও উত্তর আধুনিকতানিবন্ধে। তিনি বলেছেন, Post Modernism বলে যে ধারণা পশ্চিমা সভ্যতায় চালু হয়েছে তা মূলত বিশৃঙ্খল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তৈরী যা মানুষের রোগ, শোক ও চিকিৎসার নিমিত্তে উদ্ভাবিত এবং তা কেবল সিনেমা নির্মাণেই সহযোগিতা করতে পারে।  অথচ উত্তর আধুনিক বচনের প্রকরণ হবে সহজিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে যা ইউরো-আমেরিকার Post Modernism এর সম্পূর্ণ বিরোধী ও একই সাথে মৌলিক।’ (সরকার আজিজ, ঔপনিবেশিকতা, কবিতা ও উত্তর আধুনিকতা)

বাংলা ভাষাভাষিদের ডিসকোর্সে যে বিষয়টি ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তা হল পোস্টমডার্নিজমএর পরিভাষা উত্তরাধুনিকবাদ’; আর এর থেকে সরে এসে নিজেদের জন্য যে মতবাদের কথা তারা বলতে চাইছেন তা হল, ‘উত্তর আধুনিকবাদঅর্থাৎ এখানে পদগুলোকে সমাসবদ্ধ করা হয়নি।  সে অর্থে আমি উত্তরাধুনিকএবং উত্তর আধুনিকপ্রিফেক্স দুটো পৃথক তাৎপর্যেই ব্যবহার করেছি।  যাই হোক এ কথা ঠিক যে, ভারতীয় উত্তর আধুনিকতাকোনক্রমেই পশ্চিমা পোস্টমডার্নিজমের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে না। অথবা সঙ্গতি রক্ষা করা সভ্যতা বিবর্তনের যৌক্তিকতায় সম্ভবও নয়।  বাঙালি সংস্কৃতি আশ্রিত উত্তর আধুনিকতামনে করে, আমাদের ভারতবর্ষের আধুনিক যুগটি ছিল মূলত ঔপনিবেশিক আধুনিকতা।  সুতরাং এই আধুনিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের জাতিগত সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা সম্ভব হয়নি বরং লঙ্ঘিত হয়েছে।  সুতরাং আমাদের লুপ্ত ধারাবাহিকতাকে পুনরুদ্ধার করতে হলে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার আগ থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে।  অথচ আমাদের ওপর চেপে বসে আছে দুশ বৎসরের ঔপনিবেশিক আধুনিকতার পরিমণ্ডল।

এক্ষণে কেন উত্তর আধুনিকতা’, এ বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া দরকার।  আশির দশকের শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গের অমিতাভ গুপ্ত, অঞ্জন সেন, ধীরেন চক্রবর্তী প্রমুখ এ বিষয়ে বেশ কিছু ধারণা উপস্থাপন করেন।  ইনারা প্রস্তাব আকারে ধারণাটিকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।  তাঁদের মতে উত্তর আধুনিকতাকোন কালবাচক অভিধা নয় বরং এই অভিধা বিগত সময়ের ঔপনিবেশিক অবক্ষয়ের আধুনিকতাকে পাশ কাটাতে চায়।  এ বিষয়ে আরও লক্ষ রাখতে হবে, ইংরেজি পোস্টমডার্নিজম আর উত্তর আধুনিকতা অবশ্যই একই অর্থবহ বিষয় নয়।  তারা এও মনে করেন, পশ্চিমা আধুনিকতা তিরিশোত্তর কবিদের প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে।

এ পর্যায়ে আমি বলতে চাই, তিরিশোত্তর কবিদের প্রতি অন্যায় আচরণ নয় বরং এই সময়ের কবিগণ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার মদদ যুগিয়েছেন।  এই ঔপনিবেশিক আধুনিকতা অর্থাৎ অবক্ষয়ের আধুনিকতা মূলত একটি বিকারগ্রস্থ আধুনিকতা।  উত্তর আধুনিকমতবাদ অনুসারে বুর্জোয়া মানবতাবাদের আবেগপ্রবণতা তথা বিকৃত যৌনতাবাদের বিপরীতে উত্তর আধুনিকতার অবস্থান।  এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে উত্তর আধুনিকমতবাদ মনে করে আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের লুপ্ত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে খুঁজে বের করতে হবে।

বাংলা ভাষাভাষি উত্তর আধুনিকগণ মনে করেন বা বলে থাকেন, আর্থ-সামাজিক তথা সভ্যতার বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, তথা শিল্পতত্ত্বের নান্দনিক ব্যাখ্যায় শেষ আশিতে এসে বাংলা কবিতা গ্রহণযোগ্য বাঁক পরিগ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রশ্ন হল এর জন্য কি আমাদের উত্তর আধুনিকদের প্রেসক্রিপশনকে অনুসরণ করতে হয়েছে? অনিবার্যত বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালি ঐতিহ্য-বিযুক্ত নয়।  এর জন্য উত্তর-আধুনিক ধারণাকে মতবাদ হিসাবে অথবা ধ্রুব বলে মেনে নেবার যৌক্তিকতা কতটুকু? বাঙালি জনজীবনে উত্তর-আধুনিকতা বলতে কি আমরা শুধুই বাংলা কবিতার বিবর্তন ধারাকে বুঝবো? নাকি এটা কোন সমাজ-পরিবর্তনজনিত দৃষ্টিগ্রাহ্য মুভমেন্ট? অথবা এ কথাটিও ভাববার বিষয়, উত্তর আধুনিক মতবাদ সার্বিক অর্থে বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে আমাদের সামগ্রিক শিল্প-সংস্কৃতির রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বক ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম কিনা।

যাই হোক, ‘পোস্টমডার্নএবং উত্তর আধুনিকপ্রিফেক্স দুটোকে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ নেই।  বরং আমি বিষয় দুটো নিয়ে আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশিদের আপ্লুত বোধ করার আপাতত কোন কারণ দেখছি না।  যদিও কিছু কিছু পণ্ডিত আজও উইলিয়াম কেরী কৃত পাঠশালার পণ্ডিতদের মতো ঔপনিবেশিক ধ্যান ধারণা লালন করে পোস্টমডার্নিজমের প্যারালাল হিসাবে অথবা পোস্টমডার্নিজমের বাংলা প্রতিশব্দ উত্তরাধুনিকতাবাদকে বিবেচনায় এনে পক্ষান্তরে উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্বকে পুষ্টি দিয়ে চলেছেন।  এ অবস্থায় পাঠ্যপুস্তকনির্ভর ঔপনিবেশিক শিক্ষা এবং উক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত অধ্যাপকগণের অন্ধভাবে পুস্তক অনুকরণ, সেইসাথে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের জাতিগত পরিচয়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের বিষয়ে কীভাবে সতর্ক হওয়া সম্ভব; বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা যেতে পারে।  পাশাপাশি বাঙালি আধুনিকতা বলতে আমরা কী বুঝবো সে বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া আবশ্যক।

পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তার পোস্টমডার্ন ভাবনা ও অন্যান্যগ্রন্থে বাঙালিদের ভেতর পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিক কবিতা চর্চার অসরতা উপস্থাপন করেছেন; যা অবশ্যই আমলযোগ্য।  কেননা বাংলা সাহিত্যকে পোস্টমডার্নিজমের সাথে গুলিয়ে ফেলার কিছু নেই।  ১৯৯৪ সালে আমাদের দেশে দায়িত্ব নিয়েই পোস্টমডার্নিজম বিষয়ে লিখেছেন সালাহউদ্দীন আইয়ুব।  তিনি ইহাব হাসান, ডানিয়েল বেল, জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার, রোলা বার্থ, মাতেই কালিনেস্কু, জেরোমি মেজারো, চার্লস রাসেল, অক্টাভিও পাজ, এস. ল্যাশ, ডি. হার্ভে, ই. এ. কাপলান, এন. নিকলসন থেকে শুরু করে জাক দেরিদা পর্যন্ত অনেকেরই টেক্সট অনুসন্ধান করে বিস্তারিত প্রমাণাদিসহ আমাদের কাছে পোস্টমডার্ন ডিসকোর্সটি উপস্থান করেন।  তিনি আমাদের দেশে লিরিকপত্রিকা আশ্রিত আবেগনির্ভর উত্তর আধুনিক কবিতা চর্চার তত্ত্বীয় কাঠামোর অসারতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

চট্টগ্রামে ছোটকাগজ লিরিককে আশ্রয় করে পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিকতার চর্চা মূলত আমদানি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের অমিতাভ গুপ্তসহ বেশ কয়েক জনের অবিরাম লেখালেখির প্রভাবে।  তাদের সমাজ-পর্যবেক্ষণের বেশকিছু বিষয় আমলে না আনার কোন কারণ দেখি না।  তবে কবিতার ক্ষেত্রে এ কথা বলতেই হচ্ছে, বাংলা ভাষায় উত্তর আধুনিক কবিতা বলে পৃথকভাবে কবিতাকে চিহ্নিতকরণের যৌক্তিকতা এখনও খুঁজে পাওয়া মুশকিল; বরং বাঙালি সংস্কৃতিতে অধুনা যে পশ্চিমা সংস্কৃতি মিশ্রণের ছটা দেখা যাচ্ছে তার প্রেক্ষিতে আমাদের চেতনা ও অভিজ্ঞান যেমন বদলে যাচ্ছে তেমনি কবিতার আঙ্গিক ও অন্তর্বস্তুর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তা পরিবর্তনশীল সময়কে অনুসরণ করবে এটাই স্বাভাবিক; আমরা তা চাই আর না চাই; আমরা তা বুঝি আর নাই বা বুঝি।

এক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ও সাহিত্যসমালোচক টেরি ইগলটনের মন্তব্যটিও ভাবনায় ফেলে; যদিও আমি তার সাথে এখনও একমত নই।  তিনি মনে করেন, ‘সাহিত্যের প্রচলিত মূল্যায়ন বুর্জোয়া সমালোচনার দান বলে তাকে উড়িয়ে দেয়ার অতি-বাম চিন্তা একেবারেই ভুল; বরং মার্কসবাদী সমালোচনার কর্তব্য এই সমস্যার দায়িত্বপূর্ণ আলোচনা করা।  সাহিত্যের মূল্যায়নে পাঠকের ভূমিকাই বড়ো যেমন পণ্যের মূল্য ক্রেতার চাহিদার উপর নির্ভরশীল। উভয় ক্ষেত্রেই বিনিময়ের দ্বারা মূল্য নির্ধারিত হয়।  অন্যভাবে বলা যায় মূল্যবান লেখা তার পাঠক সৃষ্টি করে, আবার এই পাঠকের ফলেই লেখার সৃষ্টি সম্ভব।’ (টেরি ইগলটন, মার্কসবাদ ও সাহিত্য সমালোচনা, নিরঞ্জন গোস্বামী অনূদিত)

তো এ অবস্থায় সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতির জগতে ভোক্তাচাহিদা ও রুচি যেভাবে পালটে যেতে শুরু করেছে সেক্ষেত্রে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিও বদলে যেতে বাধ্য কিনা, বিষয়গুলো নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণের অবকাশ রয়েছে। পাশাপাশি আমরাদের সংস্কৃতির জগতে আমরাও পশ্চিমাদের পোস্টমডার্নিটি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি কিনা, সমাজবিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও অনুসন্ধানযোগ্য।

          ০৩          

আলোচনার শেষে এসে, যদিও আমি আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের সন্ধান রাখার যোগ্যতা রাখি না তথাপি আমি আমাদের অনুসন্ধানসমূহ মিলিয়ে নিতে ইচ্ছুক। অনুসন্ধানে প্রশ্ন রেখেছিলাম পোস্টমডার্নিজম কি মডার্নিজমের ধারাক্রম প্রকাশজ্ঞাপক অভিধা? অনেকের মত আমারও মনে হয়েছে, মডার্নিজমের ধারাক্রম পোস্টমডার্নিজম নয়। এ বিষয়ে আমি সালাহউদ্দীন আইয়ুবের সাথে একমত। তিনি অনেকটা এভাবে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেছেন,

(১) মডার্নিজমকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে- একটি ব্যাখ্যা নান্দনিক; অন্যটি সমাজরাজনীতিনির্ভর
(২) মডার্নিজম একটা অসম্পূর্ণ প্রকল্প
(৩) মডার্নিজমের সঙ্গে মডার্নাইজেশনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এবং সেই ঘনিষ্ঠতা এই অসম্পূর্ণতার জন্যে দায়ী
(৪) মডার্নিজমের সঙ্গে পোস্টমডার্নিজমের বিশেষ কোনো যোগ নেই
(৫) পোস্টমডার্নিজম মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়পর্বের সংস্কৃতির ব্যাখ্যা
(৬) পোস্টমডার্নিজমের সঙ্গে পোস্টস্ট্রাকচারালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ প্রথমটি মূখ্যত আমেরিকার একটি ঘটনা, দ্বিতীয়টি ফরাশি দেশের; প্রথমটির লক্ষ্য মার্কিন সংস্কৃতির রূপান্তর নির্দেশ, দ্বিতীয়টির উদ্দেশ্য মডার্নিজমেরই নান্দনিক উত্তরভাষ্য
(৭) অনেক বিতর্ক থাকলেও পোস্টমডার্নিজম থেকে জ্ঞানজগতে ও সংস্কৃত অঙ্গনে বহু অভিনব ডিসকোর্সের জন্ম হয়েছে : যার মধ্যে নারীতন্ত্র আছে, সংস্কৃতি-ব্যাখ্যায় লৈঙ্গিক বাস্তবতার ভূমিকা আছে, অরিয়েন্টিলিজম, পশ্চিম-বহির্ভূত সমাজ-সংস্কৃতি, এমনকি আধুনিকতার পুনর্বিবেচনা আছে।
(সালাহউদ্দীন আইয়ুব, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা)

পরবর্তী অনুসন্ধান ছিল, আধুনিক এবং উত্তরাধুনিকের সম্পর্কটা কেমন? এই সম্পর্কের বিষয়টি ইতোমধ্যে সামান্য হলেও আমাদের কাছে এক ধরনের অবয়ব লাভ করেছে।  যেখান থেকে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি অবক্ষয়ী আধুনিকতা থেকে কীভাবে পোস্টমডার্নিজম বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে এবং আমাদের এখানে তা ভিন্ন ডিসকোর্সে একটি পৃথক অর্থাৎ পোস্টমডার্নিজমের সমান্তরাল নয় বরং বিপরীতে উত্তর আধুনিকপ্রিফেক্সটি তৈরি হয়েছে।

আমাদের তৃতীয় অনুসন্ধান ছিল, পশ্চিমাদের মডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিজমের নিকট তৃতীয় বিশ্বের অর্থাৎ আমাদের অবস্থান কোথায়? এ বিষয়ে ইতোমধ্যে নানাবিধ নমুনা ও মতাতম হাজির করলেও আমি নেডারভিন পিটারসের এম্পায়ার এন্ড ইমানসিপেশনথেকে উদ্ধৃতি দিতে ইচ্ছুক।  তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার বিতর্কে তৃতীয় বিশ্বের প্রসঙ্গ অনুচ্চারিত। প্রবল বিশ্বের প্রতিপক্ষে বিপুল প্রান্তের পৃথিবী সেখানে আক্ষরিক অর্থে অনুপস্থিত। এই বিতর্ক সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমের নিজস্ব বিতর্ক; এই বিতর্ক হলো পশ্চিমের এক কুইজ : পশ্চিমের প্রশ্ন এবং পশ্চিমের জবাব।’ (সালাহউদ্দীন আইয়ুব, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা)

শেষ তিনটি অনুসন্ধান ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কেন পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিকতাবাদের সূত্রপাত হল? আমাদের দেশে উত্তর আধুনিকতার বিষয়টি কীভাবে চর্চা করা হয়েছে, হচ্ছে এবং এর যৌক্তিকতা ও ফলাফল কেমন? বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? অর্থাৎ সতর্কতা কতটুকু এবং কেনই বা এই সতর্কতা? এ পর্যন্ত আলোচনায় এ বিষয়গুলোর অল্পবিস্তর ডিসকোর্স ইতোমধ্যেই আমাদের চিন্তনে দানা বাঁধতে শুরু করেছে বলে মনে করছি। যদিও এ জিজ্ঞাসাগুলোর পাশাপাশি এর বাইরেও ইতোমধ্যে প্রাসঙ্গিকতার প্রয়োজনেই নানাবিধ অনুসন্ধান ও নমুনা হাজির করতে বাধ্য হয়েছি। এক্ষেত্রে হয়তো সবকিছু গুছিয়ে যুক্তি পরম্পরায় উপস্থাপিত হয়নি। এ জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কেননা এমন একটি বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছি যেখানে নিজের অংশ গ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে; তথাপি যে সকল সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যা আমার নিজেস্ব, যদিও বৈশ্বিক সভ্যতা পর্যবেক্ষণে নিজেস্ব বলে কিছু থাকে না বরং আমরা সতর্ক পর্যবেক্ষণ থেকেই সবকিছু গ্রহণ-বর্জন ও মূল্যায়ন করে থাকি তথাপি বলছি আমার পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যার পেছনে আমি আমার কাণ্ডজ্ঞান ও সততা থেকে উপযুক্ত নমুনা হাজির করার চেষ্টা করেছি।

অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আমি সততার সঙ্গেই পর্যবেক্ষণের প্রচেষ্টা জারি রাখার চেষ্টা করেছি। অনুসন্ধান করেছি ইহাব হাসান, জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার, ফ্রেডরিক জেমসন, এডওয়ার্ড সাইদ, মিশেল ফুকো, জাক দেরিদা, এমে সেজায়ার, চিনুয়া আচেবে সহ প্রাসঙ্গিক লেখক ও চিন্তাবিদদের রচনাসমূহ। বাংলা ভাষায় অনূদিত ও সম্পাদিত বইগুলোর মধ্যে আমাকে সাহায্য করেছে লায়লা ফেরদৌস অনূদিত ফ্রেডরিক নিৎশে : ভালো-মন্দের সীমানা পেরিয়ে’, তপোধীর ভট্টাচার্যের টেরি ঈগলটন’, পারভেজ হোসেন ও ফয়েজ আলম সম্পাদিত জ্যাক দেরিদা : পাঠ ও বিবেচনা’, অভিজিৎ চক্রবর্তীর জাক দেরিদা’, পারভেজ হোসেন সম্পাদিত মিশেল ফুকো’, রফিকুল রনি অনূদিত নোয়াম চমস্কির সাম্রাজ্যবাদীদের উচ্চাভিলাষ’,  ফয়েজ আলম অনূদিত এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদের অরিয়েন্টালিজম’, ফয়েজ আলমের উত্তর-উপনিবেশী মনসহ প্রাসঙ্গিক গ্রন্থাদি। প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনে কে কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেগুলোও আমলে রাখা হয়েছে।

এতকিছু মিলিয়ে দেখতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, বর্তমান সভ্যতায় ঘটমান বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে পোস্টমডার্নিটির গতিবিধি ব্যাখ্যা করার এখনও যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আমার সংশয় জেগেছে, আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি কি কিছুটা সংক্ষুব্ধ নয়? যার ওপর দাঁড়িয়ে আদৌ কি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভব? আদৌ কি নিরপেক্ষতা বলে কিছু আছে, বা সম্ভব? আমাদের কি সব সময় সতর্ক অবস্থায় থেকে অর্থাৎ আমরা আদার’ / ‘হীন’-  এই সতর্কতা মাথায় নিয়ে বৈশ্বিক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে না? সম্ভবত তৃতীয় বিশ্বের মানুষের ভেতর এহেন সংশয়বোধ চালান করে দেওয়াটাও ছিল পোস্টমডার্নিজমের আরেকটি অভিসন্ধি।

এমনতর বিভ্রমের নিয়ন্ত্রণে আমরা নতুন করে আশলে কিছুই বলছি না বা ভাবতে পারছি না। আমি যা-ই ভাবছি না কেন, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তা কেউ না কেউ অনেক আগেই বলে গেছেন; বা আশে পাশে আপনার মত আরও অনেকেই ভাবছেন। আমি বিষয়টিকে পজেটিভলি দেখি; কারণ এতে নতুন ভাবনার সন্ধান পাওয়া না গেলেও অন্তত একটি বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে আমাদের ভাবনাসমূহের সহযোদ্ধা রয়েছে; আর ভাবনাবিষয়ক সহযোদ্ধা থাকার কারণে ভানাগুলোর আশ্রয়ে ভাবনার জগতে মুভমেন্ট আশা করা যেতে পারে। তারপরও রয়েছে ভাবনার বিচ্যুতি। বিচ্যুতিআমাদের চারপাশে নানাভাবেই হয় বা হচ্ছে। বিচ্যুতি মানে পোস্টনা বা বিবর্তনও না। তবে তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের অজান্তেই হতে পারেন; অন্যদের করতে পারেন। এখানেই তাত্ত্বিক বিষয়ে চর্চার প্রবহমানতার বিষয়টি জরুরি। প্রায় তত্ত্বই গড়ে ওঠে নিকট বা দূর ও সমকালের নানা ঘটনা, জ্ঞান, তত্ত্বকে আশ্রয় করেই, ভবিষ্যতের জন্য বা কখনও সমকালকে এগিয়ে নিতেও। ফলে আপনি দেরিদা, ফুকো, লাকা, সাঈদ এভাবে যাঁকে যাঁকেই পাঠ করুন বা বুঝেন, আপনাকে আপনার নিজের পথ বা মতকে অন্যের সাথে না মিলাতে পারলে তা অন্যেগ্রহণ করবে না।

আমরা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ, আমাদের সমস্যা হল আমরা আমাদের জানাকে এগিয়ে নিতে চাই না এবং একবার ওই যে মানুষ হয়ে বা কোন গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে জন্ম নিয়েছি তা আর এগিয়ে নিই না।  ফলে আমাদের নির্ভর করতে হয় ছলচাতুরি বা জোরজবরদস্তির ওপর।  পশ্চিমাদের জোরজবরদস্তির ওপর নির্ভরশীল থেকে সেইসাথে ছলচাতুরির সাথে সম্পৃক্ত থেকেও তৈরি হতে থাকে সামাজিক চিন্তাসমূহ। এবং তাকেও আমাদের জানতে হয়, বুঝতে হয়।  নইলে চলমান জীবন বা সমাজ বা রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি বা সমস্যাকে আমরা অন্ধের হস্তি দর্শনের মতো জ্ঞাত হই।


⧪⧪⧪⧪⧪⧪⧪⧪⧪⧪⧪⧪

লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

শিমুল মাহমুদ
জন্ম ৩ মে ১৯৬৭ সাল। জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ, বাংলাদেশ। কর্মসূত্রে বর্তমানে রংপুরে বসবাস। কথাসাহিত্যিক, কবি ও  গবেষক। পেশা অধ্যাপনা। উল্লেখযোগ্য রচনা: উপন্যাস— সুইসাইড নোট [২০১৯]শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [২০০৭]। গল্পগ্রন্থ- ইলিশখাড়ি ও অন্যান্য গল্প [১৯৯৯]। কাব্যগ্রন্থভাষাদের শস্যদানা [২০১৯]কন্যাকমলসংহিতা [২০০৭]প্রাকৃত ঈশ্বর [২০০০]সাদাঘোড়ার স্রোত [১৯৯৮]মস্তিষ্কে দিনরাত্রি [১৯৯০]। কবিতাসংগ্রহ— সপ্তহস্ত সমুদ্রসংলাপ [২০১৪]। প্রবন্ধ—  মিথ-পুরাণের পরিচয় [২০১৬]বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কবিতা [২০১২]কবিতাশিল্পের জটিলতা [২০০৭]। ই-মেইল : shimul1967@gmail.com

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ